শেনজেনের উপকূলীয় ব্যবসায়িক এলাকায় অবস্থিত একটি দোকানের প্রবেশপথ দেখলে আপনার মনে হতে পারে এটি কোনো হাই-সিকিউরিটি জোন। ভেতরে ঢোকার আগে ক্রেতাদের ব্যাগ জমা রাখতে হয়, হাতে পরতে হয় সাদা রেশমি দস্তানা। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলেই দেখা যায় অন্য এক দৃশ্য। সেখানে শ্যানেল, গুচি বা ডিওরের দামি হ্যান্ডব্যাগগুলো কোনো শৈল্পিক আলোকসজ্জার নিচে নয়, বরং সাজানো রয়েছে স্বচ্ছ কাঁচের বাক্সে। প্রতিটি পণ্যের গায়ে প্রাইস ট্যাগের বদলে রয়েছে কিউআর কোড, যা স্ক্যান করলে খুচরা মূল্যের চেয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাওয়া যাচ্ছে। খবর সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।
এটি চীনের উদীয়মান সেকেন্ড হ্যান্ড লাক্সারি প্ল্যাটফর্ম 'জেডজেডইআর' এর একটি শোরুম। চীনের ধনাঢ্য এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত শ্রেণির কেনাকাটার ধরনে যে আমূল পরিবর্তন আসছে, এ শোরুমটি তারই প্রতীক।
পরিসংখ্যান বলছে, চীনের সেকেন্ড হ্যান্ড লাক্সারি বাজার ২০২০ সালে ছিল মাত্র ৮ বিলিয়ন ডলারের। ২০২৫ সালের মধ্যে এটি ২৭৫ শতাংশ বেড়ে ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করছে ড্যাক্সু কনসাল্টিং। যেখানে নতুন লাক্সারি পণ্যের বাজার বছরে ৩ থেকে ৫ শতাংশ সংকুচিত হচ্ছে, সেখানে পুনঃবিক্রয়ের এই বাজার বাড়ছে রকেটের গতিতে।
২০১৫ সালে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করা জেডজেডইআর ২০২২ সালে সাংহাইয়ে বড় পরিসরে অফলাইন স্টোর খোলে। গত বছর শেনঝেন শাখা চালুর পর হাংঝোউ ও চেংদুতে সম্প্রসারণ হয়। সর্বশেষ গত সপ্তাহে বেইজিংয়ে নতুন স্টোর চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ বিস্তার চীনের সামগ্রিক ভোক্তা প্রবণতারই প্রতিফলন। পরিণত ই-কমার্স অবকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের ভোগব্যয়ের ফলে জমে থাকা বিপুল বিলাসপণ্যের জোগান—সব মিলিয়ে চীনের সেকেন্ড হ্যান্ড বিলাসবাজার দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।
জেডজেডইআর এর শেনঝেন শাখা। ছবি- সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
বিশ্লেষকদের মতে, কভিড মহামারিই ছিল টার্নিং পয়েন্ট। বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ থাকায় চীনা ভোক্তারা ডেউ-এর মতো দেশীয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে ঝুঁকেন, যেখানে আসল পণ্য যাচাইয়ের সুনাম তৈরি হয়েছিল। ডিজিটাল লাক্সারি গ্রুপের চীনবিষয়ক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জ্যাক রোইজেন বলেন, ‘একবার যখন ভোক্তারা অফিসিয়াল বুটিকের বাইরে বিলাসপণ্য কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে শুরু করলেন, তখন সেকেন্ড হ্যান্ড পণ্য গ্রহণ করায় আর কোনো বড় বাধা থাকল না।‘
আগে ব্যবহৃত পণ্যকে নকল বা নিম্নমানের বলে দেখার প্রবণতা ছিল চীনে। কিন্তু উন্নত অথেনটিকেশন প্রযুক্তি ও শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো সেই অনাস্থা অনেকটাই দূর করেছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সু তিয়ানচেন বলেন, ‘অর্থনীতি পরিণত হলে সেকেন্ড হ্যান্ড বাজার বড় হয়। ২০ বছরের প্রবৃদ্ধির পর চীনে বিলাসপণ্যের মালিকানা বেড়েছে, যা এখন তৈরি করছে পুনর্বিক্রির সুযোগ।‘
মহামারির পর অসম পুনরুদ্ধার, সম্পত্তি খাতের সংকট ও মূল্যস্ফীতির চাপ চীনা মধ্যবিত্তকে আরো হিসেবি করে তুলেছে। অনেকেই এখন নতুন বিলাসপণ্যের বদলে কম দামে মানসম্মত ব্যবহৃত পণ্য কিনতে আগ্রহী। শেনঝেনের বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী ঝ্যাং একসময় শ্যানেলের নিয়মিত ক্রেতা ছিলেন। দুই বছর আগে রেস্তোরাঁ ব্যবসা বন্ধ করার পর তিনি সেকেন্ড হ্যান্ডে ঝুঁকেছেন। তার ভাষায়, ‘ডিজাইনার ব্যাগ এখন ভীষণ দামি। সেকেন্ড হ্যান্ড ব্যাগ নিরাপদ, মান ভালো এবং অনেক সস্তা।‘
তবে দ্রুত বৃদ্ধির পরও চীনে সেকেন্ড হ্যান্ড বিলাসবাজার মোট বিলাসখাতের মাত্র ৫ শতাংশ। উন্নত দেশগুলোতে এই হার ২০–৩০ শতাংশ। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং লাইভ-স্ট্রিমিং কেনাকাটার জনপ্রিয়তার কারণে এই বাজার ভবিষ্যতে আরো বড় হবে।